
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। শীতের শেষ দিক। কুয়াশায় পুরো রেলস্টেশন ঢেকে গেছে। দূরের লাইটগুলো ঝাপসা হয়ে আছে। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস এসে শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ছোট্ট স্টেশনটার নাম—রামপুরঘাট। দিনে এখানে কিছুটা ভিড় থাকলেও রাতে জায়গাটা প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়।
স্টেশনের এক কোণায় পুরোনো একটা বেঞ্চে বসে ছিল শুভ।
তার বয়স তেইশ-চব্বিশ হবে। গায়ে কালো জ্যাকেট, হাতে ছোট একটা ব্যাগ। চোখ দুটো লাল। মনে হচ্ছিল অনেকদিন ঠিকমতো ঘুম হয়নি।
সে বারবার ফোন বের করে সময় দেখছিল। রাত ১২টা ৩৭।
ঢাকাগামী শেষ ট্রেন আসতে এখনও প্রায় চল্লিশ মিনিট বাকি।
শুভ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আজকের রাতটা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাতগুলোর একটা। সকালেও সে ভাবেনি যে এভাবে সবকিছু বদলে যাবে।
দুপুরে বাবার সঙ্গে তার প্রচণ্ড ঝগড়া হয়। এত বড় ঝগড়া আগে কখনও হয়নি। তার বাবা চেয়েছিলেন শুভ বিদেশে যাক, টাকা আয় করুক, সংসারের হাল ধরুক। কিন্তু শুভ ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসত। সে একটা আর্ট কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল।
বাবা রাগ করে বলেছিলেন,
“ছবি আঁইকা পেট চলব?”
শুভ চুপ ছিল।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে যাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। কাউকে কিছু না বলে। শুধু একটা ব্যাগে কয়েকটা জামা আর তার আঁকার খাতাটা নিয়ে চলে আসে স্টেশনে।
তার মনে হচ্ছিল, এই বাড়িতে তার কোনো জায়গা নেই।
হঠাৎ পাশ থেকে একটা কাশি দেওয়ার শব্দ শোনা গেল।
শুভ তাকিয়ে দেখল, একটু দূরে এক বৃদ্ধ লোক বসে আছে। গায়ে ময়লা ধূসর চাদর। মাথাভর্তি সাদা চুল। পাশে একটা পুরোনো ব্যাগ।
লোকটা শান্ত চোখে শুভর দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাবা, ট্রেন ধরবা?”
শুভ ছোট্ট করে বলল,
“হুম।”
“কোথায় যাইবা?”
“ঢাকা।”
“ঢাকায় কে আছে?”
শুভ উত্তর দিল না।
বৃদ্ধ লোকটা হালকা হাসল।
“যারা উত্তর দিতে চায় না, তাদের মনেই সবচেয়ে বেশি ঝড় থাকে।”
শুভ একটু অবাক হলো। কিন্তু কিছু বলল না।
স্টেশনের লাইটের নিচে কুয়াশা ঘুরছিল। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বৃদ্ধ আবার বললেন,
“বাড়ি থেইকা রাগ কইরা আইছ?”

শুভ এবার তাকাল।
“আপনি বুঝলেন কীভাবে?”
লোকটা মৃদু হেসে বলল,
“এই স্টেশনে আমি বিশ বছর ধইরা মানুষ দেখি। কে পালায়, কে ফিরে যায়—চেহারা দেখলেই বুঝি।”
শুভ হালকা বিরক্ত হয়ে বলল,
“সবাই কি শুধু টাকা বুঝে? কেউ কি স্বপ্ন বুঝে না?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“তোর স্বপ্ন কী?”
“আমি ছবি আঁকতে চাই।”
“তাইলে আঁক।”
“এত সহজ?”
“না, সহজ না। কিন্তু অসম্ভবও না।”
শুভ হেসে ফেলল তিক্তভাবে।
“আপনি জানেন না বাস্তবতা কাকে বলে।”
বৃদ্ধ এবার নিজের ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খাতা বের করলেন। খাতার পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে।
তিনি শুভর হাতে দিলেন।
খাতাটা খুলতেই শুভ থমকে গেল।
ভেতরে অসাধারণ সব ছবি আঁকা। গ্রামের দৃশ্য, নদী, মানুষের মুখ, বৃষ্টির রাত—এমন নিখুঁত ছবি সে খুব কম দেখেছে।
শুভ বিস্মিত হয়ে বলল,
“এগুলো কে এঁকেছে?”
বৃদ্ধ শান্তভাবে বললেন,
“আমি।”
শুভ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
লোকটা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
“তোর বয়সে আমিও ছবি আঁকতাম। অনেক স্বপ্ন আছিল। ঢাকায় যামু, বড় শিল্পী হমু। কিন্তু সংসার, দায়িত্ব, টাকার চিন্তা—সব মিলাইয়া স্বপ্নটা মাইরা ফেললাম।”
বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত একটা শূন্যতা ছিল।
“তারপর?”
“তারপর জীবন কাটাইছি। সংসার চালাইছি। কিন্তু একটা জিনিস কখনও ভুলতে পারি নাই।”
“কী?”
“যেদিন নিজের স্বপ্নরে ভয় পাইছিলাম।”
শুভ চুপ হয়ে গেল।
বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
বৃদ্ধ আবার বললেন,
“শোন, বাবা। সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। কিন্তু চেষ্টা না করলে মানুষ সারাজীবন আফসোস করে।”
“কিন্তু যদি ব্যর্থ হই?”
“ব্যর্থ হওন খারাপ না। চেষ্টা না করাই খারাপ।”
শুভর বুকের ভেতর কেমন যেন লাগছিল।
দূরে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ শোনা গেল।
ঢাকাগামী ট্রেন আসছে।
স্টেশনের বাতিগুলো কাঁপছিল হালকা বাতাসে।
শুভ উঠে দাঁড়াল। ট্রেন ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। জানালাগুলো আলোয় ভরা।
সে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো—সে কি সত্যিই পালিয়ে যাচ্ছে?
বাড়ি থেকে?
নিজের মানুষদের থেকে?
নাকি নিজের ভয় থেকে?
সে পিছনে তাকাল।
বৃদ্ধ লোকটা বেঞ্চে বসে শান্তভাবে তাকিয়ে আছে।
শুভ ধীরে ধীরে ট্রেন থেকে সরে এলো।
ট্রেন কয়েক মিনিট পর হুইসেল দিয়ে চলে গেল।
পুরো স্টেশন আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
“যাইলা না?”
শুভ আস্তে করে বলল,
“হয়তো আগে কথা বলা দরকার।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন,
“এইটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।”
শুভ ফোন বের করল।
অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বাবার নম্বরে কল দিল।
ওপাশে কয়েকবার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ হলো।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর শুভ আস্তে করে বলল,
“আব্বা…”
ওপাশ থেকে কাঁপা গলায় উত্তর এলো,
“কোথায় তুই?”
শুভর চোখ ভিজে উঠল।
অনেকদিন পর সে বুঝল, রাগের চেয়েও বড় জিনিস হলো—ফিরে আসা।
ফোন রেখে সে পাশের বেঞ্চে তাকাল।
কিন্তু বৃদ্ধ লোকটা সেখানে নেই।
চারদিকে কুয়াশা ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছিল না।
শুধু বেঞ্চের ওপরে পড়ে ছিল সেই পুরোনো আঁকার খাতাটা।
শুভ ধীরে ধীরে খাতাটা হাতে নিল।
প্রথম পাতার নিচে ছোট করে লেখা ছিল—
“স্বপ্নকে ভয় পাইস না।”
